*”মিথ্যার মিনারে সত্যের সমাধি”*
“কওমী জননী”—
একদা এই উপাধি রণহুঙ্কারের মতো ছুটেছিল রাজপথজুড়ে,
যেন মাইকের গর্ভ বিদীর্ণ করে
আকাশের কর্ণকুহরে প্রবেশ করবে তার আর্ত গর্জন।
কিন্তু— “ভ্যাক্সিন হিরো”?
সে তো এই প্রজাতন্ত্রের প্রাঙ্গণে উদিত এক নির্বাক সূর্য,
যার জ্যোতি কুয়াশা নয়,
ইচ্ছাকৃত অপপ্রচারের কালো পর্দায় আবৃত রাখা হয়েছিল—
কারণ এই ভূখণ্ডে কীর্তির চেয়ে কৌশল,
উন্নয়নের চেয়ে উপাখ্যান,
এবং সত্যের চেয়ে শোরগোল অধিক বিক্রয়যোগ্য।
এই দেশ আজ এক বিভ্রমমঞ্চ—
এখানে জ্বলেনা আলো সত্যের তরে,
জ্বলে অন্ধকারকে মহিমান্বিত করার জন্য।
প্রচারযন্ত্র এখানে সংবাদ নয়—
এ এক ধূম্র-দানব,
যার বিষাক্ত নিঃশ্বাসে রুদ্ধ হয় সত্যের ফুসফুস,
আর ইতিহাসের কণ্ঠে জমে ওঠে রক্ত।
মুজিববাদের চার স্তম্ভ—
যা ছিল রাষ্ট্রদেহের অস্থিমজ্জা,
আজ তাকে বিকৃত আয়নায় দেখিয়ে
কেউ কেউ প্রমাণে ব্যস্ত—
এই প্রজাতন্ত্র নাকি এখনো দাঁড়িয়ে আছে
ভগ্ন আস্থার পচা খুঁটির উপর!
যেন বৃক্ষ ফল দিলে তার শিকড় অস্বীকার করাই
এ যুগের নববুদ্ধির লক্ষণ।
বুদ্ধিজীবীরা ছিলেন জাতির ধ্রুবতারা—
কিন্তু ধীরে ধীরে তাদের দীপ্তি নির্বাপিত করে
আসীন হয়েছে কাগুজে প্রদীপ,
যারা মতাদর্শ নয়,
বাতাসের দিক বুঝে অবস্থান বদলায়;
যারা বিবেক নয়,
বরং সুবিধাবাদের বর্ণিল মুখোশ।
তাহাজ্জুদের সিজদা হয়ে যায় প্রথম পাতার অগ্নিশিরোনাম,
মোনাজাতকে বানানো হয় রাষ্ট্রীয় বিতর্কের মহাকাব্য;
কিন্তু—
একটি শিশুর দেহে প্রবেশ করা জীবনরক্ষী টিকা,
একজন নারীর উপার্জিত প্রথম বেতন,
একটি মায়ের নিরাপদ প্রসব—
এসব নীরবে নির্বাসিত হয় পরিসংখ্যানের সমাধিক্ষেত্রে,
যেখানে ক্যামেরা প্রবেশ করে না,
কারণ সেখানে নাটক নেই—
আছে কেবল স্বদেশ প্রেমে আবৃত কঠিন বাস্তবতা।
আছে জাতি ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতা।
যখন কোভিড-১৯ পৃথিবীর সাম্রাজ্যগুলোকে হাঁটু গেড়ে বসিয়েছিল,
যখন তথাকথিত উন্নত সভ্যতা লাশ গুনছিল শীতল গুদামে,
তখন এই বাংলাদেশ
সুঁইয়ের ডগায় লিখেছিল এক অদৃশ্য মহাকাব্য।
‘গণটিকাদান’ ছিল যুদ্ধ—
মানবতার পক্ষে, মৃত্যুর বিরুদ্ধে;
কিন্তু যুদ্ধশেষে ইতিহাস লিখেনি সেই সেনাপতির নাম,
জাতি স্বীকার করেনি সে মহাকবির নাম।
‘পদ্মা সেতু’—
এ কি শুধু নদীর উপর নির্মিত সেতু?
এ ছিল আন্তর্জাতিক সংশয়ের মুখে
একটি জাতির আত্মসম্মানের স্থাপত্য।
‘মেট্রোরেল’—
এ কি শুধু রেলগাড়ি?
এ তো নগরসভ্যতার বুকে উৎকীর্ণ
সময়ের বিরুদ্ধে মানুষের বিজয়ঘোষ।
তবু এর চেয়েও মহত্তর ছিল—
মানুষের আয়ু বৃদ্ধি,
শিশুমৃত্যুর অবনমন,
নারীর অর্থনৈতিক অভ্যুদয়,
গ্রামের উঠোনে উঠোনে উন্নয়নের প্রথম পদচিহ্ন।
কিন্তু এসবের ফিতা কাটার মঞ্চ হয় না—
কারণ মানবোন্নয়ন ক্যামেরাবান্ধব নয়,
আর নীরব বিপ্লব কখনো শ্লোগান তোলে না।
এদিকে কিছু দেশদ্রোহী প্রবঞ্চক
খুলে বসেছে মিথ্যার কারখানা—
তারা প্রতিশ্রুতি ছোঁড়ে আকাশে আতশবাজির মতো,
আর কিছু জনতা উৎসের অগ্নি নয়,
শুধু ক্ষণিকের ঝলক দেখে করতালি দেয়।
কারণ এই দেশে দর্শক অনেক,
দূরদর্শী কম।
এখানে গুজবের আছে ডানা —
সত্যের কেবল পদযুগল।
এখানে মিথ্যা পায় মঞ্চ, মাইক, মিছিল—
সত্য পায় নিঃশব্দ প্রামাণ্যপত্র।
এই জাতিকে বাস্তব দেখাতে হয়
চোখে অঙ্গুল দিয়ে;
শোনাতে হয় সত্য
কর্ণপটে বজ্রাঘাত হেনে।
সতেরো বছরের দীর্ঘ ইতিহাস এক অনর্গল প্রবহমান নদী—
যেখানে উন্নয়নের তরঙ্গ ছিল,
অর্জনের জোয়ার ছিল,
কিন্তু মানচিত্রকারেরা ইচ্ছাকৃত অন্ধত্বে
তার তীররেখা অঙ্কন করেনি।
তাই আজ প্রশ্ন—
রাষ্ট্র কি ব্যর্থ?
নাকি ব্যর্থ তারা,
যারা রাষ্ট্রের অর্জনকে নীরবতার কবরস্থানে সমাহিত করেছে?
করেছে মিথ্যার মিনারে আরোহণ?
নাকি বিশ্বাসঘাতক ইতিহাসলেখকেরাই
কালির বদলে বিষ ঢেলে
মুছে দিয়েছে আলোর ইতিবৃত্ত?
দন্ডিত করেছে নির্বাসন?


















